বহুমুখী প্রতিভাধর শিল্পী জুবিন গার্গ
।। ড. প্রশান্ত চক্রবর্তী ।।
গুয়াহাটি, ২১ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : অসমের দুরন্ত বহুমুখী কণ্ঠশিল্পী, যুবপ্রজন্মের হার্টথ্রব জুবিন গার্গ নেই। সিঙ্গাপুরে এক সাগর-দুর্ঘটনায় তাঁর অকাল প্রয়াণ ঘটেছে।
জুবিনের সম্পূর্ণ নাম জুবিন বড়ঠাকুর। জন্ম মেঘালয়ের গারো হিলসের তুরায়। বাবা মোহিনীমোহন (কপিল) বড়ঠাকুর, মা ইলি বড়ঠাকুর। আদিবাড়ি উজান অসমের শিবসাগরের টিয়কে, যোরহাটে তাঁর মাতুলালয়। বাবা অসম সরকারের বদলিযোগ্য আধিকারিক হওয়ার সুবাদে তাঁর শৈশব কৈশোর ও স্কুলজীবন কেটেছে অসমের বিভিন্ন জায়গায়। গোটা পরিবার ছিল সংগীতময়। বিখ্যাত শিল্পী ‘জুবিন মেহতা’-র নাম অনুসারে তাঁর নাম ‘জুবিন’ রাখা হয়েছিল। যোড়হাট, ধুবড়ি, তামুলপুর, করিমগঞ্জ (বর্তমান শ্রীভূমি) সহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁর স্কুলজীবন কেটেছিল। পরবর্তীকালে তিনি গুয়াহাটির বি বরুয়া কলেজে ভর্তি হন। সেই সময়ই তাঁর সংগীতজীবনে আনুষ্ঠানিক প্রবেশ। তিনি ছিলেন জন্মসূত্রে প্রতিভাবান। কিশোরকুমার, কুমার শানুর মতো সংগীতের কোনও প্রথাসিদ্ধ তালিম ছিল না তাঁর। তবে তবলায় বিশারদ ছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি কি-বোর্ড বাজাতেন। বাজাতেন নানারকম চর্মবাদ্য, তালবাদ্য। এহেন প্রচলিত বাদ্যযন্ত্র ছিল না, যা তিনি বাজাতেন না।
পরে তিনি কেবল কণ্ঠশিল্পী রূপেই আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথম অ্যালবাম ১৯৯২-তে। অনামিকা। রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন তিনি। আর ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক অ্যালবামে গোটা অসম মাতিয়ে তোলেন। তালিমবিহীন অদ্ভুত একটি মাদকতাময় ন্যাচারাল কণ্ঠ ছিল তাঁর। ভূপেন হাজরিকার পর অসমে তিনি ছিলেন সুপার সেলিব্রেটি কণ্ঠশিল্পী। পরবর্তীকালে পাপনের আগমন ঘটলেও জুবিনের জনপ্রিয়তা ছিল চিরকাল তুঙ্গে। তাঁকে ছাড়া অসমের বিহুমঞ্চ কল্পনাও করা যায় না। ৪০টি ভারতীয় ভাষায় ৩৮ হাজার গান গেয়েছেন তিনি। মাতৃভাষা অসমিয়া ছাড়া বাংলা, হিন্দিতে তাঁর অনেক গান সুপার-ডুপার হিট। শোনা যায়, হিন্দি সিনেমা ‘গেংস্টার’-এ তাঁর কণ্ঠের ইয়া আলিচ গানটি শুনে মুগ্ধ স্বয়ং লতা মঙ্গেশকর জানতে চেয়েছিলেন ছেলেটি কোথাকার। এরপর ধুম-থ্রি, ক্রিশ-থ্রি ইত্যাদি ছবিতে তাঁর গান চূ়ড়ান্ত হিট হয়। তাঁর একের পর এক বাংলা গানও পেয়েছে বাঙালিরা। ভূপেন হাজরিকার পর বঙ্গভুবনে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী। এখনও বাঙালির ঘরে-ঘরে বোঝে না সে বোঝে না…, প্রিয়া রে প্রিয়া রে… বাজে।
জুবিনের আকস্মিক মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই মুহূর্তেই গুয়াহাটি সহ গোটা অসম স্তব্ধ হয়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় দলে দলে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে মানুষ। স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ হয়ে যায় দোকান-বাজার। বহু সাধারণ মানুষও কান্নায় ভেঙে পড়েন। সংগীত শিল্পীদের মহলে গভীর শোক নেমে আসে। কেউই এই আকস্মিক প্রয়াণ মেনে নিতে পারছেন না। অসমের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্তবিশ্ব শর্মা তখন নিম্ন অসমে বড়োল্যান্ডে নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত। মুহূর্তেই সমস্ত কার্যসূচি বাতিল করে রাজধানী গুয়াহাটিতে ফিরে আসেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, জাতি এক পরম সম্পদ হারাল। আমাদের সবার প্রিয় জুবিনের এই মর্মান্তিক মৃত্যু অভাবনীয়, অকল্পনীয়। বিজেপি, কংগ্রেস সহ বিভিন্ন দল তাঁদের নির্বাচনী কার্যক্রম ও প্রচার স্থগিত রাখে। আক্ষরিক অর্থে গোটা অসম এখন শোকের সাগরজলে ভাসছে।
ভারতকণ্ঠ দেবজিৎ এখন আমেরিকা সফরে। জুবিনের এই মর্মান্তিক অকালপ্রয়াণে শোকস্তব্ধ দেবজিৎ আমাকে জানালেন, এই তো সেদিন ৭ সেপ্টেম্বর মুম্বাইয়ে ভূপেন হাজরিকার শতবর্ষ অনুষ্ঠানে একসঙ্গে মঞ্চে ছিলেন দুজন।
ব্যক্তিগতভাবে জুবিনকে কয়েকবার কাছে পেয়েছি। খুব উত্তম বাংলা জানতেন তিনি। একেবারে কাঁচা সিলেটিও তাঁর মুখে শুনেছি। তাঁর ছাত্রজীবন কেটেছে বরাক উপত্যকার করিমগঞ্জে (বর্তমান শ্রীভূমি)। তাঁর সিলেটি কথা শুনে চমকে উঠেছি। ভারতকণ্ঠ দেবজিতের সঙ্গে ছিল তাঁর মজার কথাবার্তার একটা নির্মল সম্পর্ক। একবার কথাপ্রসঙ্গে দেবজিৎকে তিনি বলেন, আমি তো আধা বাঙালি। সেই ভিডিওটি অসম-বঙ্গের সমন্বয়ের ইতিহাসে এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে চিরকাল। জুবিনের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত একটুকু ছোঁয়া লাগে… এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। জুবিনের আদরের ছোট বোন জংকি এক পথ দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। জংকিও মঞ্চে জুবিনের পাশে দাঁড়িয়ে অসাধারণ গাইতেন। শোনা যায়, জংকিকে হারিয়ে জুবিন সম্পূর্ণ বিষাদে বহুকাল ডুবে ছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর বেসামাল জীবনের শুরুও তখন থেকেই। জংকি আমাদের কটন কলেজে (এখন বিশ্ববিদ্যালয়) পড়তেন। একবার তিনি বোনকে নিতে কটনে আসেন এবং একটি সিনেমায় বেদমন্ত্র ছিল, সেই বেদমন্ত্রের সঠিক উচ্চারণ শেখার জন্য আমাদের সংস্কৃত বিভাগে ঢোকেন। আমি তখন ক্লাসে যাচ্ছিলাম। বিভাগে তাঁকে একা বসে থাকতে দেখে গেলাম। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাতে সময় ছিল ঘণ্টাখানেক। দুজনের একটা দীর্ঘ আড্ডা। আমি জানতে চেয়েছিলাম, বঙ্গ ও অসমের সংগীতের মূল পার্থক্য কী। তিনি একটু ভেবে বলেছিলেন, বাঙালি সুরপ্রধান জাতি। অমন অপূর্ব মেলোডির ঢেউ ভারতবর্ষে বিরল। আর অসমিয়া মূলত তালপ্রধান জাতি, রিদমিক কমিউনিটি। বিহু তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। এ-ছাড়া, নামঘরে ‘ডবা’ বা নানাপ্রকার বিরাট চর্মবাদ্য অসমিয়া জীবনের অঙ্গ।
এদিকে বঙ্গের চর্মবাদ্যগুলো মিহিন, সুরেলা, যেমন, কীর্তনিয়া খোল, মৃদঙ্গ, মন্দিরা, ছোট করতাল। তিনি বলেছিলেন, বঙ্গে ভাব ও বাণীপ্রধান গানের ধারা। রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল, রজনীকান্ত…নজরুল। উল্লাস-উত্তেজনা তুলনায় কম। শান্তরস প্রধান। প্রার্থনাসংগীত। অসমে যেমন শ্রীমন্ত শংকরদেব মাধবদেবের বরগীত। তিনি বলেছিলেন, জঙ্গল পাহাড় আদিবাসী জীবন, শক্তিধারায় চর্মবাদ্যের ব্যবহার বেশি। সেদিন এরকম ব্যাখ্যায় চমকে উঠেছিলাম। কতটা গভীর অধ্যয়ন থাকলে এই বিশ্লেষণ সম্ভব।
জুবিনের পুরো পরিবার সৎসঙ্গী। তাঁর বাবা কপিল ঠাকুরকে দেখেছি, নিয়মিত গুয়াহাটি সৎসঙ্গ মন্দিরে আসতেন। শুনেছি, জুবিনও গিটার নিয়ে আড্ডা মারতেন। তখন বয়স কম। বি বরুয়া কলেজে পড়েন। ১৯৯২-এ প্রথম অ্যালবাম বেরোল। আমরা তখন এমএ পড়ি। কলকাতার সুমনের গান, অসমে জুবিনের। কী অদ্ভুত দুটি প্রতিভাই কেমন যেন ছন্নছাড়া জীবনের দিকে গেলেন।
জুবিন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন বোহেমিয়ান উদাস শিল্পী হয়ে উঠলেন। রাতারাতি খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন। বেপরোয়া জীবন, খুল্লমখোল্লা বিতর্কিত মন্তব্য…অমিত পানাহার…সারারাত স্টুডিও…রেকর্ডিং…শুটিং…অনুষ্ঠান…। রাতভর জাগতেন। কাজে ডুবে গেলে তাঁর আর হুঁশ থাকত না। অতি পরিশ্রম, লাগামনিহীন পানাহারে তাঁর শরীর ভেঙে যায়। তাঁর জীবনে শেষমেশ যেন কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। গত কয়েক বছরে বহুবার তিনি অসুস্থ হয়েছেন। চল্লিশটি ভাষায় প্রায় আটত্রিশ হাজার গান গেয়েছিলেন তিনি। এ এক বিরাট ব্যাপক সাংগীতিক এভারেস্ট। এই শৃঙ্গে আরোহণ সহজ কথা নয়।
বিচিত্র জীবন হলেও মানুষ তাঁর অমৃত কণ্ঠের জন্য প্রশংসা করত, ভালোবাসত। তিনি মঞ্চে অনেক কাণ্ডকারখানা করতেন। সে-নিয়ে মিডিয়ায় তুমুল ঝড় উঠত। তিনি বরাবর বেপরোয়া। কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। তাঁর ভাষায় সেটা ছিল ঘেন্টা, অর্থাৎ বুড়ো আঙুল, কাঁচকলা। এ-সব সত্ত্বেও মানুষ তাঁকে পাগলের মতো ভালোবাসত। বিশেষত যুবপ্রজন্ম। তিনটি দশক তিনি অসমকে মাতিয়ে রেখেছিলেন। হাজার বিতর্ক তাঁকে এক চুলও টলাতে পারেনি। আমার ব্যক্তিগত ধারণা, তাঁর জীবনে মাইকেল জ্যাকশন, অসমের শিল্পী বিষ্ণু রাভা ও বঙ্গের কাজি নজরুল ইসলামের প্রভাব সমধিক।
ভূপেন হাজরিকার পর এমন বহুমুখী প্রতিভা অসমে আর দ্বিতীয়টি নেই। একাধারে গীতিকার, সুরকার, গায়ক, সংগীত নির্দেশক, অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক ছিলেন তিনি। আর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল, সাধারণ মানুষকে অকাতরে সাহায্য করতেন। কেউ শূন্য হাতে ফিরত না। এই প্রতিবেদন যখন শেষ করছি, তখন টিভির পর্দায় দেখছি, গুয়াহাটির রাজপথে হাজার হাজার শোকস্তব্ধ মানুষ। এই তো সেদিন ভারতরত্ন ভূপেন হাজরিকার জন্মশতবর্ষ মহা সমারোহে শুরু হলো। সেই সময়েই বিনা মেঘে এই বজ্রপাত।
জুবিনের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গান আছে, ধুমুহার সতে মোর বহু যুগরে নাচোন। অর্থাৎ, ঝড়ের সাথে আমার বহুযুগের নৃত্য। এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন : আমার মৃত্যুর পর যেন এই গানটি বাজানো হয় সর্বত্র। হ্যাঁ, এই মুহূর্তে সারা অসমে এই গান বাজছে। তাঁর আরেকটি গান ছিল, সাগরের তলায় তিনি শুয়ে থাকতে চান।
সত্যি, এক অভূতপূর্ব প্রতিভার ঝড়ের জীবন সাগরের সুনীল জলে বিলীন হয়ে গেল। অকালে।
হিন্দুস্থান সমাচার / সমীপ কুমার দাস
