শান্তি রায় চৌধুরী
কলকাতা, ১ ফেব্রুয়ারি : আগামীকাল কিংবদন্তি ফুটবল জাদুকর সামাদের ৫৪-তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি ৬৯ বছর বয়সে ফুটবলের মায়া ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন। তার পুরো নাম সৈয়দ আবদুস সামাদ। জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় ভুরী গ্রামে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান সামাদের শৈশব থেকেই প্রবল আগ্রহ ছিল ফুটবলের প্রতি। মাত্র ১৭ বছর বয়সে কলকাতার একটি ক্লাব মেইন টাউন ক্লাবের পক্ষে ফুটবল খেলতে শুরু করেন। ১৯১৮ সালে তিনি কলকাতায় এরিয়ান্স ক্লাবে খেলা শুরু করেন। ১৯২১ থেকে ৩২ সাল পর্যন্ত তিনি খেলেছেন রেলওয়ে টিমে। ১৯২৪ সালে ভারতের জাতীয় টিমে নির্বাচিত হয়ে মিয়ানমার, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ইংল্যান্ড সফর করেন। অবিভক্ত ভারতের জাতীয় ফুটবল টিমের ওটাই ছিল তার প্রথম বিদেশযাত্রা। সেবার ইংল্যান্ডের মত বিশ্বসেরা ফুটবল দলের বিরুদ্ধে অবিস্মরণীয় জয় এনে দিয়েছিলেন তিনি। সেদিন তার খেলা দেখে ইংল্যান্ডের তৎকালীন সেরা লেফট আউট কমটন চমকে উঠেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘ধারণা ছিল না এমন খেলোয়াড় এদেশে দেখতে পাব।’ ইংল্যান্ডের কৃতি ফুটবলার এলেক হোসি একবার বলেছিলেন, ‘বিশ্বমানের যে কোনো ফুটবল দলে খেলবার যোগ্যতা সামাদের রয়েছে।’
১৯৩২-এ সামাদ আইএফএর পক্ষ থেকে খেলতে গিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কায়। পরের বছর অর্থাৎ ১৯৩৩ সালে কলকাতার মহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগ দেন। সে সময় মহামেডান পরপর পাঁচবার আইএফএ শিল্ড ও লিগ জয় করে। তার অসাধারণ ক্রীড়ানৈপুণ্য প্রদর্শন করার জন্য সে বছর আইএফএ তাকে ‘হিরো অব দ্য গেমস’ উপাধিতে ভূষিত করে। সামাদের ক্রীড়াজীবনে অনেক স্মরণীয় ঘটনা আছে।তারমধ্যে ১৯২৪ সালে ইংল্যান্ডের একটি ঘটনা। তখন লন্ডনে এক ফুটবল প্রতিযোগিতায় তার শট করা বল গোলবারের উপরের পোস্টে লেগে ফিরে আসে। সাথে সাথে তিনি তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেন, বলটি গোলে গেছে। রেফারিকে নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে বলেন, ‘গোলবারের উচ্চতা কম। তাই গোল হয়নি।’ অনেক বাগবিতণ্ডার পরে মেপে দেখা যায়, সামাদের অভিযোগ সত্য। গোলবার নির্ধারিত উচ্চতার চেয়ে দেড় ইঞ্চি নিচু। অতএব সামাদ গোল করেছেন বলে মেনে নিতে হল। বিশ্বে এমন ঘটনার কথা কখনো শোনা যায়নি। ওই ঘটনার পর সামাদ পরিচিতি পেলেন ‘ফুটবল জাদুকর’ হিসেবে। খেলার মাঠে সব সময়ই পায়চারি করতেন। বল পেলেই তীব্র গতিতে প্রতিপক্ষের গোলমুখে ছুটে যেতেন। ১৯৪৫ সালে বাংলাদেশের দিনাজপুর শহরের মাঠে সামাদ জীবনের শেষ খেলা খেলেছেন।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আবদুস সামাদ সপরিবারে পার্বতীপুর চলে আসেন। সেখানে রেলওয়ের ইন্সপেক্টর হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে অবসর নিয়েছিলেন। এরপর কিছুদিন ঢাকায় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের অধীনে কোচের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বাসভবন লুট হয়েছিল। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে এই অবিস্মরণীয় প্রতিভার প্রতি সম্মান জানিয়ে মৃত্যুর তিন দশক পরে ডাক বিভাগ স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ পারল, কিন্তু আমরা পারলাম না। আসলে সামাদকে আমাদের বর্তমান প্রজন্ম চেনে না,চিনবেই বা কি করে। সামাদকে চেনার জন্য যে উদ্যোগ দরকার তা তো আমাদের সরকারের নেই, নেই কোন ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানেরও। এই ফুটবল জাদুকরের ৫৪তম মৃত্যুবার্ষিকীতে থাকছে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
