সাব্রুম (ত্রিপুরা), ১৪ সেপ্টেম্বর (হি.স.) : দক্ষিণ ত্রিপুরা জেলার সাব্রুম মহকুমার অন্তর্গত ছোটখিল এলাকার অর্ধশতবর্ষ প্রাচীন লীলাগড় চা বাগান আজ গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদা সুনামের সঙ্গে পরিচালিত এই চা বাগান এখন দুঃশাসন, দুর্নীতি এবং কর্তাব্যক্তিদের নির্মমতার কারণে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। শতাধিক শ্রমিকের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত, আর বাগানের ঐতিহ্য ধ্বংসের পথে।
বিগত সময়ে লীলাগড় চা বাগান শ্রমিকদের জন্য ছিল নিরাপত্তার প্রতীক। অসুস্থ হলে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা হত, শ্রমিকদের ভাঙা ঘর মেরামতের দায়িত্ব নিত সমিতি। বনদফতরের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা সুদৃশ্য শিশু উদ্যান ছিল পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। শাপলা দীঘি থেকে প্রাপ্ত মাছ বিক্রি করে শ্রমিক উন্নয়ন খাতে অর্থ ব্যবহার করা হত। দুর্গাপূজা বা নববর্ষের মত বিশেষ দিনে এই দীঘির মাছ শ্রমিকদের পাতে বিনামূল্যে পৌঁছে যেত। পূজা উপলক্ষে বোনাস থাকত ২০ থেকে ২৩ শতাংশ পর্যন্ত।
কিন্তু বর্তমান চিত্র কেবল অবহেলার ও শোষণের। এখন চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। দীঘিটি শ্রমিকদের অনুমতি ছাড়াই লিজে তুলে দেওয়া হয়েছে পুঁজিপতিদের হাতে। পূজার সময় শ্রমিকদের বোনাস নামিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ৮ শতাংশে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে শ্রমিকদের জন্য এ সিদ্ধান্ত একেবারেই হৃদয়বিদারক।
শ্রমিকরা বলছেন, কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত তাদের ভাতের হাঁড়িতে ‘বাঁশি’ তুলে দিয়েছে। সবচেয়ে বড় অভিযোগ সমবায় সমিতির কর্তা ব্যক্তিদের ঘিরে। শম্ভু সরকার নামে এক চুনোপুঁটি, যে শাসক দলে যেই থাকে তার উর্দি ধারণ করে চালিয়ে যায় তার লুটতরাজ। সে শ্রমিক সমিতির ৩০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। তদন্তে ধরা পড়েছে, শুধুমাত্র ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে তিনি শ্রমিকদের নামে-বেনামে এবং যন্ত্রপাতি খরিদের অজুহাতে প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রকাশ্য মিটিংয়ে আংশিক অর্থ আত্মসাতের কথা স্বীকারও করেছেন তিনি।
শ্রমিকদের বরাদ্দ টাকা লুটের এই অভিযোগ সামনে আসতেই বাগানে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। সমিতি ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত শম্ভু সরকারকে সময় দিয়েছে টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য, না হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাগানের শ্রমিকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির চক্রও পাল্টেছে রূপ। বাম আমলে যিনি শ্রমিকদের পিঠে চেপে অর্থ লুট করেছেন, সেই শম্ভু সরকার বর্তমানে বিজেপিতে যোগ দিয়ে আবারও প্রভাব বিস্তার করছেন। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দূরে থাক, বরং চুপচাপ সমর্থন দিচ্ছে শাসক দলেরই উর্দিধারী একাংশ চুনোপুটি। নেতৃত্বদের রীতিমত ঘুমে রেখে তারা ক্রিমি কিটের মত ধ্বংস করে দিচ্ছে এ বাগান।
বাগান সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর প্রায় ২০৫০ টন চা উৎপাদন হয়ে থাকে। অথচ শ্রমিকদের মজুরি দৈনিক মাত্র ১৮৬ টাকা। অধিকাংশ শ্রমিক দ্বিগুণ সময় কাজ করেও সামান্য বাড়তি আয় করেন। ৮২ জন স্থায়ী শ্রমিক ও প্রায় ২০০ অস্থায়ী শ্রমিকের ঘামে ভেজা এই চা বাগান, অথচ তাদেরই প্রাপ্য অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে।
গোটা বিষয়কে কেন্দ্র করে অনিশ্চয়তার দোলাচলে বর্তমানে শ্রমিকরা। আজ শ্রমিকরা ভয়াবহ আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বোনাস কমেছে। মহার্ঘ ভাতা কেটে নেওয়া হয়েছে। দীঘির মাছ আর শ্রমিকদের পাতে ওঠে না। কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির ভার চাপছে সরাসরি শ্রমিকদের কাঁধে। চা বাগানের সমিতির সম্পাদক লক্ষ্মণ সিং সংবাদ মাধ্যমকে জানান, তিনি ততটা শিক্ষিত নন, আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একাউন্টেন্ট সহ অন্যান্যরা যত্রতত্র উনাকে দিয়ে সই করিয়ে নেন। পক্ষান্তরে একাউন্টেন্ট রতন হাজারীর বক্তব্য, তিনি এই অর্থ আত্মসাৎ এর ব্যাপারে একেবারেই ক অক্ষরে গোমাংস। গোটা বিষয় সম্বন্ধে সংবাদ মাধ্যম তাঁর কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি একপ্রকার ডুমুরের ফুল হয়ে যান।
বর্তমানে বাগান সূত্রে জানা গেছে, এই অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে শ্রমিকরা ইতিমধ্যেই সংঘবদ্ধ হতে শুরু করেছেন। যদি প্রাপ্য ফেরত না মেলে, তবে বড় আন্দোলনের পথে নামবেন তাঁরা।
একদা রাজ্যের গর্ব ছিল লীলাগড় চা বাগান। আজ তা দাঁড়িয়ে আছে ধ্বংসের প্রান্তে। দুর্নীতি আর কর্তৃপক্ষের নির্মমতা শ্রমিকদের পেটের ভাত কেড়ে নিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—কবে ফিরবে সেই সোনালি দিন। নাকি ইতিহাসে মিলিয়ে যাবে এই বাগানের ঐতিহ্য। বর্তমানে শ্রমিকদের দাবি একটাই—“আমাদের ঘাম-ঝরানো প্রাপ্য ফেরত দাও।”
হিন্দুস্থান সমাচার / গোবিন্দ দেবনাথ
