দুর্গাপুর, ৫ জানুয়ারি (হি. স.) ‘ছিল বিড়াল হল রুমাল।’ ছিল রিফ্যাক্টরী। হয়ে গেছে কয়লা ডিপো। আর সেখানেই রাতভর চলছে কয়লার চাঁঙড় ভাঙার কাজ। আর ওই বিকট শব্দের সঙ্গে কয়লাগু়ঁড়োয় ওষ্ঠাগত প্রান আশপাশের বাসিন্দাদের। প্রতিবাদ করায় পাল্টা বস্তি তুলে দেওয়ার হুমকির শিকার। আতঙ্কে এলাকাবাসী প্রশাসনের দারস্ত। এমনই দুষণে জেরবারের ছবি ধরা পড়ল দুর্গাপুর ২৯ নং ওয়ার্ডের এনএন বোস রোডে শ্রমিকপল্লী এলাকায়। প্রশ্ন উঠেছে, ওই কয়লা ডিপোর বৈধতায়।প্রসঙ্গত, কয়লাকান্ডে তোলপাড় গোটা রাজ্য। কেন্দ্রীয় গয়েন্দা সংস্থা সিবিআই ও রাজ্যের সিআইডি অবৈধ কয়লার চোরাচালনে ধরপাকড় শুরু করেছে। ঘটনায় একাধিক কয়লা মাফিয়া ধরা পড়েছে। ঘটনার তদন্তে জোর তৎপরতা শুরু করেছে রাজ্য কেন্দ্র উভয় গয়েন্দা বিভাগ। এমনকি খনি সংস্থা ইসিএলের বেশ কয়েকজন আধিকারিকও গ্রেফতার হয়েছে। কয়লা পাচার কাণ্ডে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশ রয়েছে বলে অভিযোগ তদন্তকারী সংস্থার। একইসঙ্গে তদন্তকারীদের র্যাডারে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছোট শিল্প সংস্থা। বছরখানেক আগে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ অবৈধ কয়লা পাচার রুখতে সক্রিয় হয়েছিল। বেশ কিছু অবৈধ কয়লা পাচারের হদিশ উদ্ধার করেছিল।
ধরপাকড়ের মাঝে আবার সক্রিয় কয়লা পাচারচক্র। গত কয়েকমাস ধরে বন্ধ কারখানার আড়ালে রমরমিয়ে চলছে অবৈধভাবে কয়লা পাচার ও মজুতের রমরমা কারবার। গত আগস্টের শেষের দিকে দুর্গাপুর-ফরিদপুর থানার সরপি এলাকায় সিমেন্ট ফ্যাক্টরীর আড়ালে অবৈধ কয়লা কারবারের হদিশ পায় পুলিশ। ঘটনায় সিমেন্ট ফ্যাক্টরী থেকে বাজেয়াপ্ত করে ১০ মেট্রিক টন অবৈধ কয়লা। তার কয়েকদিন আগে কাঁকসার বাঁশকোপায় অবৈধ কয়লা বোঝাই তিনটি লরি ধরা পড়ে পুলিশের জালে। ঘটনায় দুজন চালক গ্রেফতার হয়। ওই ঘটনার তদন্তে নেমে পুলিশ আসানসোলের সালানপুরে একটি বেসরকারী ফ্যাক্টরীর কয়লা পাচার চক্রের হদিশ পায়। যেখান থেকে ওইসব কয়লা পাচার হচ্ছিল। সেখানে কয়লা ছাড়াও জেসিবি মেশিন বাজেয়াপ্ত করে পুলিশ। তারপর আবারও নতুন করে কয়লা পাচারের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দুর্গাপুর ২৯ নং ওয়ার্ডে এনএনবোস রোডে বিগত কুড়ি বছর ধরে বন্ধ একটি রিফ্যাক্টরীতে বিশাল এলাকাজুড়ে কয়লা মজুত করা হয়েছে। আশপাশের বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতভর কয়লার চাঙড় ভাঙা ও কিছু মেশানোর কাজ চলে। তাতে বিকট শব্দ যেমন হয় তেমনই কয়লার গুঁড়োয় ওষ্ঠাগত প্রান। আশপাশের গাছপালা, থেকে রাস্তাঘাট কয়লার গুঁড়োয় ভর্তি। গোটা পরিবেশটি যেন আস্ত একটা কোলিয়ারি তৈরী হয়েছে। আর তাতেই প্রশ্ন উঠেছে ওই ফ্যাক্টরীর বৈধতা ও দুষণ নিয়ন্ত্রন পর্ষদের ছাড়পত্র নিয়ে। যদিও দুর্গাপুর দুষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ মুখ খুলতে চায়নি। এমনকি কারখানা কর্তৃপক্ষও কিছু বলতে চায়নি। এলাকায় রয়েছে একটি ইংরাজি মাধ্যম স্কুল, অঙ্গওয়াড়ী সেন্টার ও একাধিক ছোট কারখানা। স্থানীয় বাসিন্দা বৈশাখি চঁদ ও আরতি আঁকুড়ে প্রমুখ জানান, সকালে গোটা ঘরবাড়ি সব কয়লার গুঁড়োর স্তর পড়ে যায়। রান্না করা খাওয়ার সময় কয়লার গুঁড়ো পড়ে। ছোট ছেলেমেয়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। আমরা পরিচারিকার কাজ করি। মনিবের বাড়ীতে কাজ সেরে এসে আবার ওই কয়লার গুঁড়ো পরিস্কার করতে হয়।
বাসিন্দারা আরও বলেন, কয়কেদিন আগে কারখানাটির গেটে প্রতিবাদ করেছিলাম। তখন শাসকদলের মদতে আমাদের বস্তি থেকে তুলে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। তাই চরম আতঙ্কে রয়েছে। পুলিশকে জানিয়েছি। পার্শ্ববর্তী একটি কারখানার শ্রমিক বিকাশচন্দ্র পাল জানান, কয়লা চাঙড় ভাঙার সময় ব্যাক ফিল্টার বসানো দরকার ছিল। কিন্তু দুষণ নিয়ন্ত্রণের কিছুই তোয়াক্কা করে না। তাই বাতাসে কয়লার গুড়ো। ওই কয়লাগুঁড়োর দাপটে টিফিনে খাবার খাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। বাড়িতে গিয়ে নাক পরিস্কার করার সময় কালো কফ বের হয়। ফলে যক্ষা রোগের আশঙ্কায় আতঙ্কে রয়েছে।
সিপিএম নেতা পঙ্কজ রায় সরকার বলেন,রাজ্যের প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রন করছে কয়লা, বালি, লোহা কারবারিরা। পুলিশ প্রশাসন ও শাসকদলের মদতে চলছে এই কয়লা কারবার। বন্ধ কারখানার ভেতরে এভাবে কয়লার কারবার কখনই চলা উচিত নয়। আমরা বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামব। যদিও শ্রমিকপল্লীর ঘটনা প্রসঙ্গে পশ্চিমবর্ধমান জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সহ সভাপতি স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, বস্তিটতে হত দরিদ্র পরিবারের বসবাস। দুষণের অভিযোগ সত্য। পুরনো বন্ধ ইটভাটাকে ঘিরে কয়লা ড্রোজিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। কোথা থেকে কিভাবে কয়লা আসছে জানা নেই। তবে কয়লারগুঁড়োয় দুষণে নাজেহাল আশপাশের বাসিন্দারা। বিষয়টি স্থানীয় থানায় ও জেলার দুই মন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। এই দুষন বন্ধ হওয়া দরকার। যদিও ঘটনা প্রসঙ্গে কোকওভেন থানার পুলিশ জানিয়েছে, সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হিন্দুস্থান সমাচার / জয়দেব
