কলকাতা, ৩০ সেপ্টেম্বর (হি.স.):
উত্তর কলকাতায় শোভাবাজার হাটখোলায় আমাদের পূর্বপুরুষদের ঠাকুরবাড়ি। গোপালজীর নিত্যপুজো হয় ওখানে। ওখানে কয়েক পুরুষ ধরে নিষ্ঠাভরে আমাদের পারিবারিক পুজো হয়। বংশপরম্পরায় পরিবারের শরিকরা কর্মসূত্রে ছড়িয়ে গিয়েছেন বিভিন্ন স্থানে। তাঁরা অধিকাংশই এসে যান পুজোর এই সময়টায়। এ এক অদ্ভুত ভালোলাগা!
ছাত্রাবস্থায় যে উন্মাদনা ছিল ওই পুজোকে ঘিরে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্র বদলেছে। খবরের কাগজে কর্মজীবন শুরু। ফিরতে রাত হলেও স্বপনে ছিল পরদিন সকালের পুজো। পরে দূরদর্শনে যোগ দেওয়ার পর অফিসে ডিউটি পড়ত সপ্তমী ও নবমী। একটু বড় হলে কেবল নবমী। কিন্তু মন জুড়ে থাকত ওই ঠাকুরবাড়ির পুজো।
বিকেলের পর কখনও বন্ধুদের সঙ্গে, কখনও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বার হতাম। সঙ্গে একটু খাওয়া দাওয়া। এখন আগের তুলনায় বয়স বেড়েছে। কমেছে বার হওয়ার অবকাশ। দুর্গাপুজোর চরিত্রও বদলেছে। গ্রামের পুজো, পাড়ার পুজো, আবাসনের পুজো— এই বিবর্তনের মাঝেও যেন একটা সর্বধর্ম সমন্বয়ের সুর বেজে চলেছে দুর্গাপুজোকে ঘিরে।
বোনের শ্বশুরবাড়ি কাটোয়ার কাছে কৈচোরে। একবার পুজো আর রমজান একসঙ্গে পড়ে যাওয়ায় পংক্তিভোজনের সময়টা পিছিয়ে দেওয়া হল। এ সব অনুভবের বিষয়। আমাদের কলেজের প্রাক্তনী সংগঠনের সদস্য এক মুসলিম বন্ধু আর তাঁর স্ত্রী গভীরভাবে যুক্ত তাদের আবাসনের পুজোতে। বন্ধু কোষাধ্যক্ষ আর তার স্ত্রী যুক্ত আবাসনের বাচ্চাদের নিয়ে পুজোকে ঘিরে নানান সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। পুজোর আঙিনায় এগুলো একটা আলাদা মাত্রা তৈরি করে।
ছোটবেলায় ইংরেজি নববর্ষে ক্যালেন্ডার এলেই পাতা উল্টে দেখতাম পুজো কবে। দিন যত এগোত, প্রহর গুনতাম। এখন পুজোর সূচি বদলেছে। ঘরে বসে পুজোসংখ্যা পড়ি। মনে ভাসে পুজোকেন্দ্রিক নানা দৃশ্য। যাতায়তের পথে হরিশার হাটে দেখতাম ফুটপাথের পসরা থেকে গরিব বাবা-মা বাচ্চাদের লাল-নীল ছিটের জামা কিনে দিচ্ছে। মনে পড়ে খুদের মুখে কী আনন্দের অভিব্যক্তি! অকালে আমাদের ছেড়ে চিরকালের মত চলে গিয়েছে, এরকম অনেকের কথা মনে পড়ে। ওঁদের কারও কারও বাড়িতে ফোনে পরিবারের সদস্যদের কুশল সংবাদ নিতাম।
সব মিলিয়ে পুজো এখন একটা বড় অর্থনীতি। সবাইকে মিলিয়ে দেয় দুর্গাপুজো। সামাজিক বন্ধনটা রয়ে গিয়েছে অটুট! পুজোর সকালটা কিন্তু বরাদ্দ থাকে হাটখোলায় পূর্বপুরুষদের ঠাকুরবাড়িতেই।
(ডঃ স্নেহাশিস সুর – বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সভাপতি কলকাতা প্রেস ক্লাব। সাক্ষাৎকার- অশোক সেনগুপ্ত)
—————
হিন্দুস্থান সমাচার / অশোক সেনগুপ্ত
