মণিপুর : শান্তির পথে এক নতুন পদক্ষেপ
সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ মণিপুর এক সংবেদনশীল কিন্তু আশাব্যঞ্জক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। বহু বছরের অশান্তি ও জাতিগত সংঘর্ষের পর আজ রাজ্যে দেখা যাচ্ছে সতর্ক আশাবাদ। অপারেশন স্থগিত (SoO) চুক্তির পুনর্নবীকরণ, ইম্ফল–দিমাপুর জাতীয় সড়ক পুনরায় চালু হওয়া, জনগণের সরকার পুনরুদ্ধারে রাজনৈতিক প্রচেষ্টা, এবং স্থানীয় মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনী একসঙ্গে ক্রিকেট খেলার দৃশ্য—এসবই ধীরে ধীরে সমাজের আরোগ্যের ইঙ্গিত। শান্তির পথে যাত্রা এখনও অসম্পূর্ণ, কিন্তু এর প্রভাব মণিপুরের সীমা ছাড়িয়ে বহুদূর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
SoO চুক্তি : ভিত্তি
SoO মানে Suspension of Operations—অর্থাৎ অস্ত্র নামিয়ে আলোচনার পথ খোলা। ২০০৮ সালের আগস্টে এই চুক্তি হয় কেন্দ্র, মণিপুর সরকার এবং ২৫টি কুকি জঙ্গি সংগঠনের মধ্যে। তখন যোদ্ধাদের বিশেষ শিবিরে পাঠানো হয়, অস্ত্র ডাবল-লকে রাখা হয়, নতুন সদস্য নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয় এবং যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে আলোচনা টেবিলে বসতে সম্মত হয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নতুন শর্ত যোগ হয়—শিবির পুনর্গঠন, অস্ত্র জমা দেওয়া, প্রাক্তন জঙ্গিদের ভাতা আধার কার্ডের সঙ্গে যুক্ত করা এবং রাজনৈতিক আলোচনার জন্য সময়সীমা নির্ধারণ।
রাজনৈতিক পরিবর্তন
চুক্তি কাঠামো দেয়, কিন্তু এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে রাজনীতির ওপর। এখন রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন চলছে। তবে ইম্ফল রাজভবনে গভর্নর অজয় কুমার ভল্লা, সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিংসহ বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বার্তাটি স্পষ্ট—বিজেপি আবার সরকার গঠনে প্রস্তুত। বিজেপি বিধায়ক থোকচোম রাধেশ্যাম জানিয়েছেন, NPP, NPF, JD(U) ও নির্দলীয় মিলিয়ে ৪৪ জন বিধায়ক রাজি আছেন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১৩ সেপ্টেম্বর ইম্ফল সফর রাজনৈতিক পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। কংগ্রেস চাইছে প্রধানমন্ত্রী সব বিধায়কের সঙ্গে দেখা করুন এবং হিংসা কবলিত এলাকা পরিদর্শন করুন।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা
সেপ্টেম্বরের শুরুতে টেংনৌপাল জেলায় ছয় জঙ্গিকে ধরা হয়। ইম্ফল পূর্বেও ছয়জন গ্রেপ্তার হয়, সাথে বাজেয়াপ্ত হয় পিস্তল, রাইফেল, গ্রেনেড ইত্যাদি। সরকার দশ হাজারেরও বেশি Village Defence Force সদস্যের মেয়াদ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
ইম্ফল–দিমাপুর জাতীয় সড়ক (NH-2) খোলা হয়েছে, যদিও কিছু বিধিনিষেধ এখনো বহাল আছে।
ক্রিকেটের বার্তা
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ইম্ফলে স্থানীয় মানুষ ও নিরাপত্তা বাহিনী ক্রিকেট খেলেছে। সাধারণ খেলা হলেও এর প্রতীকী গুরুত্ব গভীর। ক্রিকেট আনন্দ ও ঐক্যের ভাষা। এটি দেখিয়েছে—ধীরে ধীরে বিশ্বাস ফিরে আসছে। আগে নিরাপত্তা বাহিনীকে দূরের মনে করা হতো, এখন সমাজের অংশ হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে।
বিশ্বের পাঠ
এ অভিজ্ঞতা শুধু মণিপুরের নয়। বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া ব্যবহার হয়েছে শান্তি স্থাপনে। রুয়ান্ডায় Kwibuka T20, বসনিয়ায় Football Schools, লন্ডনে Peace at the Crease, মধ্যপ্রাচ্যে Peres Center প্রোগ্রাম, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে যুব ফুটবল—সব জায়গায় দেখা গেছে রাজনীতির চেয়ে খেলাধুলা মানুষকে কাছাকাছি আনে।
মণিপুরের তরুণরাও এগিয়ে আসছে। Youth Peacebuilding Fellowship, ওয়ার্কশপ, ক্রীড়া একাডেমি, সাংস্কৃতিক উৎসব—এসবের মাধ্যমে তাদের শান্তির দূত হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। ২০২৫ সালের আগস্টে কুকি ও মেইতেই সম্প্রদায়ের নাগরিক সংগঠন প্রথমবার মুখোমুখি আলোচনায় বসে, তাতে তরুণরাও অংশ নেয়।
মণিপুর দেখাচ্ছে—শান্তি একদিনে আসে না। তা তৈরি হয় রাজনৈতিক চুক্তি, নিরাপত্তা পদক্ষেপ, সাংস্কৃতিক সেতু ও তরুণ শক্তির সমন্বয়ে। আজ মণিপুর সম্পূর্ণ হিংসামুক্ত নয়, কিন্তু আশার আলো স্পষ্ট।
ইম্ফলের সেই ক্রিকেট ম্যাচ শেষ নয়—ওটা এক শুরু।
