মোতিহারি, ১৮ জুলাই (হি.স.): বিহারের মোতিহারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী শুক্রবার ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেছেন। এই বিষয়ে জানিয়েছে ভারত সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (পিআইবি)।
পিআইবি-র তরফে জানানো হয়েছে, পবিত্র শ্রাবণ মাসে বাবা সোমেশ্বরনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিহারের জনসাধারণের সর্বাঙ্গীন সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করেছেন। সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিহারের চম্পারণ স্থল ইতিহাস রচনা করেছে। স্বাধীনতা আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীকে নতুন দিশা দিয়েছে। আগামী দিনে বিহারের নতুন ভবিষ্যৎ গঠনেও এই স্থল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এইসব উন্নয়নমূলক প্রকল্পের জন্য বিহারের জনসাধারণকে তিনি সর্বাঙ্গীন অভিনন্দন জানিয়েছেন।
শ্রী মোদী বলেন, একবিংশ শতক বিশ্ব জুড়ে দ্রুত অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করছে। অতীতে পশ্চিমী দেশগুলির একাধিপত্যের ভাগ এখন পূর্বের দেশগুলির কাঁধে। পূর্বের দেশগুলিতে এখন উন্নয়ন গতিপ্রাপ্ত হচ্ছে। বিশ্ব ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে চলেছে। ভারতেও তেমনই পূর্বের রাজ্যগুলিতে অগ্রগতির নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। সরকারি সংকল্পের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী দিনে পুবের মোতিহারি, পশ্চিমের মুম্বাইয়ের মতোই উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করবে। গয়া হয়ে উঠবে গুরুগ্রামের মতো শিল্প নগরী। পাটনা হবে পুণের অনুরূপ। সাঁওতাল পরগনা হয়ে উঠবে সুরাট। তেমনই পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি এবং ওড়িশার জাজপুর পর্যটন ক্ষেত্রে জয়পুরের রেকর্ড স্পর্শ করবে। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলা বেঙ্গালুরুর নজির গড়বে।
ভারতের পূর্বাঞ্চলের অগ্রগতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিগত সরকারের শেষ ১০ বছরে যখন কেন্দ্রে তাদের ক্ষমতা ছিল, বিহার কেবল ২ লক্ষ কোটি টাকা পেয়েছিল। ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমাদের সরকার বিহারের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার রাজনীতিকে বন্ধ করেছে এবং বিগত ১০ বছরে বিহারের উন্নয়নে প্রায় ৯ লক্ষ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।
আজকের প্রজন্মের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দু’দশক আগে হতাশা যুবপ্রজন্মকে গ্রাস করেছিল, বিহারের উন্নয়ন থমকে গিয়েছিল এবং দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ অর্থ শাসক দলের নেতা কর্মীদের হাতে চলে যেত।
গরীব মানুষের জন্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে প্রত্যক্ষ সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ জুড়ে পিএম আবাস যোজনায় গত ১১ বছরে ৪ কোটিরও বেশি বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ লক্ষ হয়েছে বিহারে। এই সংখ্যা নরওয়ে, নিউজিল্যান্ড এবং সিঙ্গাপুরের সম্মিলিত জনসংখ্যাকেও ছাপিয়ে যায় বলে তিনি জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল মোতিহারি জেলাতেই ৩ লক্ষ পরিবার পাকা বাড়ি পেয়েছেন এবং এই সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলেছে। ১২ হাজার পরিবার আজ তাদের নতুন বাড়ির চাবি হাতে পেয়েছে। এছাড়াও, আরও ৪০ হাজার দরিদ্র পরিবারের এই পাকা বাড়ি নির্মাণের জন্য তাদের ব্যাঙ্কে টাকা পৌঁছে গেছে। এদের বেশিরভাগই হলেন – দলিত, মহাদলিত এবং অনগ্রসর সম্প্রদায়ের মানুষ। পূর্বের সরকারের আমলে গরীবদের জন্য এই বাড়ি অকল্পনীয় ছিল বলে তিনি জানান।
শ্রী মোদী বিহারের অগ্রগতিতে রাজ্যের মা ও বোনেদের সামর্থ্য ও সংকল্পের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিহারের মহিলারা এখন তাদের সরকারের গৃহীত প্রত্যেকটি পদক্ষেপের গুরুত্বের কথা বুঝতে পারছেন। ব্যাঙ্ক আমানতের সুযোগ দরিদ্র মানুষের কাছে নতুন সম্ভাবনার সুযোগ করে দিয়েছে। জন ধন অ্যাকাউন্টে সর্বতো উপকৃত হয়েছেন মহিলারা। বিহারে প্রায় ৩.৫ কোটি মহিলার জন ধন অ্যাকাউন্ট রয়েছে বলে তিনি জানান।
মহিলাদের সশক্তিকরণে সরকারের নানাবিধ উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিহারের লাখপতি দিদির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০ লক্ষ লাখপতি দিদি বিহারেই রয়েছেন। জাতীয় লক্ষ্য হ’ল – ৩ কোটি লাখপতি দিদি। সারা দেশে ইতিমধ্যে দেড় কোটি লাখপতি দিদি হয়েছেন। নীতিশ কুমারের জীবিকা দিদি প্রকল্পের প্রশংসা করে শ্রী মোদী বলেন, বিহারে লক্ষ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে উঠছেন।
বেসরকারি ক্ষেত্রে প্রথম চাকরি প্রাপকদের সাহায্যার্থে কেন্দ্রীয় সরকার সম্প্রতি একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এই প্রকল্পে বেসরকারি ক্ষেত্রে প্রথম নিয়োগপত্রে যুবক-যুবতীরা কেন্দ্রীয় সরকার থেকে ১৫ হাজার টাকা করে পাবেন। এই প্রকল্পটির সূচনা হবে পয়লা অগাস্ট থেকে। কেন্দ্রীয় সরকার এর জন্য ব্যয় বরাদ্দ করবে ১ লক্ষ কোটি টাকা। মুদ্রা যোজনা স্বনির্ভর করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বিহারে মুদ্রা যোজনায় গত দু’মাসে কয়েক লক্ষ মানুষকে ঋণ প্রদান করা হয়েছে। চম্পারণেই কেবল ৬০ হাজার যুবক-যুবতী মুদ্রা ঋণ পেয়েছেন।
নকশাল দমনে সাম্প্রতিককালে কেন্দ্রীয় সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এর বিহারের যুবসম্প্রদায় উপকৃত হয়েছেন। চম্পারণ, ঔরঙ্গাবাদ, গয়া এবং জামুই এই জেলাগুলি এক সময়ে নকশাল প্রভাবিত ছিল। এখন সেই প্রভাব ক্রমশই ক্ষীণ হয়ে আসছে। যে সমস্ত এলাকাগুলি মাওবাদী সংঘর্ষে দীর্ণ ছিল, সেই এলাকাগুলি এখন উন্নয়নের নতুন স্বপ্ন দেখছে। দেশকে সম্পূর্ণভাবে নকশাল প্রভাব মুক্ত করা সরকারের সংকল্প বলে শ্রী মোদী পুনরায় জানিয়েছেন।
বিহারের এই পবিত্র ভূমি থেকেই তিনি অপারেশন সিঁদুর – এর সংকল্পের কথা ঘোষণা করেছিলেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সারা বিশ্ব আজ এই অপারেশনের সাফল্য প্রত্যক্ষ করছে। শ্রী মোদী বলেন, বিহারে সম্পদ এবং দক্ষতার কোনও অভাব নেই। বিহারের সম্পদই অগ্রগতির নিয়ন্তা হয়ে উঠছে। সরকারি প্রয়াসের ফলে মাখানার দাম বৃদ্ধি বিহারের কৃষক সম্প্রদায়ের উপকারসাধন করেছে। সেইসঙ্গে, মাখানা চাষীদের বৃহত্তর বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রের উন্নয়নকল্পে মাখানা পর্ষদ গঠিত হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। পিএম কিষাণ সম্মান নিধি যোজনায় দেশ জুড়ে প্রায় ৩.৫ লক্ষ কোটি টাকা চাষীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। মোতিহারিতেই ৫ লক্ষেরও বেশি কৃষক এই প্রকল্পে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি পেয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার যখন পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নতিতে কাজ করে, তখন সরকারি নীতি ও সিদ্ধান্তে সেই সংকল্প প্রতিফলিত হয়। পিছিয়ে পড়া শ্রেণীর উন্নয়ন তাঁর সরকারের অগ্রাধিকার জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১১০টিরও বেশি জেলা দশকের পর দশক ধরে পিছিয়ে পড়া জেলা হিসেবে চিহ্নিত ছিল। তিনি বলেন তাঁর সরকার এইসব জেলাগুলিকে উচ্চাকাঙ্খী জেলা হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের উন্নয়নকল্পে নানাবিধ প্রয়াস হাতে নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভারতের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলি শেষ গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে অবহেলিত থেকে যেত। তাঁর সরকার নতুনভাবে এই সমস্ত গ্রামগুলিকে সংজ্ঞায়িত করে, সেই গ্রামগুলিকে প্রথম গ্রাম আখ্যা দিয়ে তাদের উন্নয়নসাধনে ব্রতী হয়েছে। শ্রী মোদী বলেন, জন মন যোজনা জনজাতি সম্প্রদায়ের উন্নয়নকল্পে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২৫ হাজার কোটি টাকা এই প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে। সাম্প্রতিককালে মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত প্রধানমন্ত্রী ধন ধান্য কৃষি যোজনা উৎপাদনের দিক থেকে পিছিয়ে পড়া ১০০টি জেলায় কৃষকদের আর্থিক উপার্জন বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কাজ করবে। দেশ জুড়ে ১ কোটি ৭৫ লক্ষ কৃষক এতে প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন, যার বেশিরভাগই বিহারে।
দেশের উন্নয়নকল্পে রেল ও সড়কের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী কয়েক হাজার কোটি টাকা এই প্রকল্পে বরাদ্দের কথা বলেন, যা যাতায়াত ব্যবস্থা ও যোগাযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। দেশের ৪টি বিভিন্ন প্রান্তের জন্য অমৃত ভারত এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রার সূচনা করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অমৃত ভারত এক্সপ্রেস এখন সরাসরি মোতিহারি – বাপুধাম থেকে দিল্লির আনন্দবিহার পর্যন্ত যাবে। মোতিহারি রেল স্টেশনকেও আধুনিকতার মোড়কে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে বলে জানান তিনি। দ্বারভাঙা – নারকাটিগঞ্জ রেল লাইন ডাবলিং – এর ফলে এই পথে রেল চলাচল আরও সুবিধাজনক হয়ে উঠবে।
ভারতের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে চম্পারণের গভীর সংযোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রাম জানকি পথ মোতিহারির সাত্তারঘাট, কেসরিয়া, চাকিয়া ও মধুবনের মধ্য দিয়ে যাবে। সীতামারী ও অযোধ্যার মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী যে নতুন রেল লাইন গড়ে তোলা হচ্ছে, তাতে চম্পারণের ভক্তদের অযোধ্যা দর্শন অনেক সহজ হয়ে যাবে। এই সমস্ত উদ্যোগ বিহারের সংযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং এলাকার নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা গড়ে তুলবে বলেও তিনি জানান।
পূর্ববর্তী সরকার দরিদ্র, দলিত, পিছিয়ে পড়া এবং জনজাতি সম্প্রদায়ের মানুষজনদের নিয়ে রাজনীতি করতো। তাদের কোনও সমঅধিকারের সুযোগ তো দেয়ইনি, তাদের পরিবারের প্রতিও কোনও সম্মান দেখায়নি। এই জাতীয় মানসিকতা থেকে বিহারকে সুরক্ষিত করার ডাক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিহারের উন্নয়নকল্পে এবং উন্নত ভবিষ্যৎ গড়তে সকলের সম্মিলিত প্রয়াসের কথা জানিয়েছেন। নতুন বিহার গড়তে তাঁর সংকল্পের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আজকে উদ্বোধন হওয়া বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য সেখানকার মানুষকে ধন্যবাদ জানিয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।
বিহারের রাজ্যপাল শ্রী আরিফ মহম্মদ খান, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী নীতিশ কুমার, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শ্রী জিতন রাম মাঁঝি, শ্রী গিরিরাজ সিং, শ্রী রাজীব রঞ্জন সিং, শ্রী চিরাগ পাসওয়ান, শ্রী রামনাথ ঠাকুর, শ্রী নিত্যানন্দ রাই, শ্রী সতীশ চন্দ্র দুবে, ডঃ রাজভূষণ চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
—————
হিন্দুস্থান সমাচার / সৌম্যজিৎ
