১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বৃহস্পতিবার দিল্লি সরকার দাঙ্গা-প্রভাবিত পরিবারগুলির ৩৬ জন নির্ভরশীলকে সরকারি নিয়োগপত্র প্রদান করেছে। দিল্লি সচিবালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা এই নিয়োগপত্রগুলি বিতরণ করেন। সরকার এই উদ্যোগকে দশকের পর দশক ধরে স্বীকৃতি ও মর্যাদার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলির জন্য এক নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা বলেন, এই নিয়োগগুলি কেবল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নয়, বরং চার দশকেরও বেশি সময় ধরে যন্ত্রণা ও অবহেলা সহ্য করা পরিবারগুলির মর্যাদা, অধিকার ও পরিচয়ের প্রতি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ ন্যায়বিচার, সংবেদনশীলতা ও দায়বদ্ধতার প্রতি দিল্লি সরকারের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে। ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা ভারতের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানটি ছিল আবেগঘন মুহূর্তে ভরা। বহু উপভোক্তা—বিশেষ করে নারী—নিয়োগপত্র গ্রহণের সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ কেউ চোখে জল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, আবার কেউ আবেগে তাঁকে আলিঙ্গন করেন। মুখ্যমন্ত্রী পরিবারগুলিকে আশ্বস্ত করেন যে সরকার প্রতিটি ধাপে তাঁদের পাশে থাকবে।
অনুষ্ঠান চলাকালীন উপভোক্তারা কৃতজ্ঞতার প্রতীক হিসেবে হলঘরের ভেতরে একসঙ্গে নিজেদের মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালান। আলোকিত হলঘরটি, কর্মকর্তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ব্যবস্থার দ্বারা উপেক্ষিত বোধ করা পরিবারগুলির জন্য নতুন আশা ও আত্মবিশ্বাসের শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠে। এই মুহূর্তটি সরকারের সিদ্ধান্তের আবেগগত গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

অনুষ্ঠানে ক্যাবিনেট মন্ত্রী মনজিন্দর সিং সিরসা, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা এবং দাঙ্গা-প্রভাবিত পরিবারগুলির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা দিল্লিতে গুরু তেগ বাহাদুরজির ৩৫০তম শহিদি বার্ষিকীর স্মরণোৎসব আয়োজনের জন্য মুখ্যমন্ত্রীকে সম্মাননাও জানান।
এই উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ১৯৮৪ সালের দাঙ্গা জাতির বিবেকের উপর এক অমোচনীয় দাগ। তিনি স্বীকার করেন যে কোনও ক্ষতিপূরণ বা সরকারি সহায়তাই ক্ষতিগ্রস্তদের প্রিয়জন হারানোর ক্ষতি পূরণ করতে পারে না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ন্যায়বিচারের পথে এগিয়ে যেতে ধারাবাহিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় স্তরে বিশেষ তদন্ত দল (SIT) গঠনসহ একাধিক সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার ফলে ন্যায়বিচারের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই অঙ্গীকারকে এগিয়ে নিয়ে দিল্লি সরকার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে মর্যাদাপূর্ণ জীবন দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করেছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানান। তাঁর মতে, এই নিয়োগপত্রগুলি চার দশকের সংগ্রাম ও অপেক্ষার পর প্রাপ্ত ন্যায়বিচারের প্রতীক। তিনি অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী সরকারগুলি বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য বাস্তব স্বস্তি বা স্থায়ী পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর দিল্লি সরকার যোগ্য নির্ভরশীলদের পদ্ধতিগতভাবে চিহ্নিত করে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করেছে। কয়েক সপ্তাহ আগে ১৯ জন নির্ভরশীল নিয়োগপত্র পেয়েছিলেন এবং বৃহস্পতিবার আরও ৩৬টি নিয়োগপত্র প্রদান করে দাঙ্গা-প্রভাবিত পরিবারগুলির প্রতি সহায়তা আরও সম্প্রসারিত করা হয়েছে। নবনিযুক্ত প্রার্থীদের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে মাল্টি-টাস্কিং স্টাফ (MTS) পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নবনিযুক্তদের অভিনন্দন জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা তাঁদের সততা, শৃঙ্খলা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তিনি উন্নত দিল্লির লক্ষ্যে সক্রিয় অবদান রাখার জন্য উৎসাহিত করেন এবং সরকারের অব্যাহত সমর্থনের আশ্বাস দেন।
ক্যাবিনেট মন্ত্রী মনজিন্দর সিং সিরসা বলেন, ১৯৮৪ সালের দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও সম্মানের জন্য দশকের পর দশক কঠোর সংগ্রাম করেছে। বহু পরিবার প্রিয়জন হারানোর আজীবন আঘাত বয়ে নিয়ে দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক লড়াই চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার ঘোষিত নিয়োগগুলি বছরের পর বছর না শুকানো ক্ষতগুলির উপর প্রকৃত অর্থে এক প্রলেপের মতো, বলেন তিনি।
সিরসা আরও জানান, দাঙ্গার প্রত্যক্ষ শিকার বহু অভিভাবকের বয়স বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের সন্তানদের চাকরি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো এই পরিবারগুলিকে অগ্রাধিকার দিতে বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতায় বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এই উদ্যোগ রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে করুণা, সেবা ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে এবং দীর্ঘদিন নীরবে যন্ত্রণা সহ্য করা পরিবারগুলির আত্মসম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলেছে।
